এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোর বিপদ আরো বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তৈরি পোশাক খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। আর বস্ত্র খাতে আরো ১ লাখ ৪৯ হাজার ১৭১ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে ব্যাংকগুলোর। সে হিসাবে এ দুই খাতে ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ঋণ স্থিতির এ হিসাব অবশ্য ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের। এরপর আর তথ্য প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত এক বছরে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। এ দুই খাতে বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যাংক নির্বাহীরা বলছেন, আগে থেকেই দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যে হারে ক্রয়াদেশ কমছে, তাতে ভালো উদ্যোক্তারাও খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে রফতানির উন্নতি না হলে দেশের ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে। এমনকি পুনঃতফসিল ও নীতিসহায়তা দিয়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটিও সফল হবে না।
বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাও একই ধরনের উদ্বেগের কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমেছে। চলতি মাসেও রফতানি বাড়বে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। রফতানি আয়ের এ টানা নেতিবাচক প্রবণতায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের দায়ও রয়েছে। যে হারে রফতানি কমছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে তাতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে নতুন সংকট তৈরির শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ২ এপ্রিল প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ—এ নয় মাসে ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হওয়া পণ্যের অর্থমূল্য ছিল ৩ হাজার ৭১৯ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে তৈরি পোশাক এবং বস্ত্রপণ্য রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৯৫২ কোটি ৯২ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ দুই খাতের ৩ হাজার ১২২ কোটি ২২ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল। সে হিসাবে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রপণ্যের রফতানি আয় কমেছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরের আট মাসই পণ্য রফতানির চিত্র ছিল নেতিবাচক। বিশেষ করে সর্বশেষ মার্চে রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। গত বছরের মার্চে যেখানে ৪২৪ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছিল, এবার তা ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলারে নেমেছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি ও জানুয়ারিতেও রফতানি কমেছিল যথাক্রমে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ এবং দশমিক ৫০ শতাংশ।
রফতানি কমে যাওয়ার বিরূপ প্রভাবে দেশের ব্যাংক খাত আরো বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে বলে জানান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা আগে থেকেই নানামুখী চাপে ছিলেন। এখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসায়ীদের চাপ আরো বেড়েছে। যে হারে রফতানি কমে যাচ্ছে, তাতে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত আরো বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানার অর্ধেক সক্ষমতা বসে আছে। কোনো কোনোটি বন্ধও হয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ আরো বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। উদ্যোক্তারা মুনাফা করতে না পারলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না এটিই স্বাভাবিক। তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। ওই সময়ে বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশই ছিল খেলাপি। গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে নানামুখী ছাড় ও উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বছরের শেষ তিন মাসে ৮৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমেছে। মূলত নীতিসহায়তা ও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয় বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানানো হয়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর দেশের ব্যাংক খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা ছিল খেলাপি। সে হিসাবে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। খেলাপি হওয়া এ ঋণের প্রায় ৩৫ শতাংশ বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের।
ব্যাংক খাতের নাজুক পরিস্থিতির মধ্যেই দেশের রফতানি আয়ে একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা এসে লাগছে। এর শুরুটা হয় ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের মধ্য দিয়ে। পাল্টা শুল্কের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ কমতে শুরু করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই আমাদের রফতানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় দেশে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারকে দ্রুত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে এবং শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয় যে দ্রুতই বাড়বে না, সেটি দেখা যাচ্ছে দেশের ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের (এলসি) তথ্যে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক আমদানির এলসি খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি নিষ্পত্তির হারও ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে। যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশেরও বেশি।
গত অর্থবছরে রফতানি আয়ের দিক থেকে দেশের শীর্ষ ১০ শিল্প গ্রুপ ছিল ইয়াংওয়ান, হা-মীম, মণ্ডল, ডিবিএল, অনন্ত, প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, প্যাসিফিক জিন্স ও মাইক্রো ফাইবার গ্রুপ। এ গ্রুপগুলোর রফতানি আয়ের ৯০ থেকে ১০০ শতাংশই ছিল তৈরি পোশাক। তবে এ তালিকায় কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল কেবল প্রাণ-আরএফএল। তৈরি পোশাকের বাইরেও এ গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রফতানি হয়।
চলতি অর্থবছরে শীর্ষ রফতানিকারক গ্রুপগুলোও ব্যবসা নিয়ে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটির রফতানি কমেছে বলে জানা গেছে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে একটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার রফতানি আয়ও কমে গেছে। ক্রয়াদেশ আসছে খুবই কম। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ দুরূহ হয়ে উঠবে।’
রফতানি আয়ের ধারাবাহিক পতন অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, গত দেড় বছরে ২০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সচল কারখানাগুলোও বর্তমান ক্রয়াদেশ দিয়ে উৎপাদন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, উপরন্তু ব্যাংক ঋণের কিস্তির চাপ রয়েছে। গত তিন বছরে শ্রমিকের মজুরি ও পরিচালন ব্যয় বেড়েছে, জ্বালানি ও ইউটিলিটি খরচও অনেক ঊর্ধ্বমুখী।
দেশের শীর্ষ রফতানি প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানি কমতে থাকলে ও ক্যাশ ফ্লো না থাকলে ঋণ পরিশোধ কঠিন হবে। বন্ধ কারখানার ঋণ অনিশ্চয়তায় পড়েছে, সচল উদ্যোক্তারাও শঙ্কিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন জ্বালানি সংকট ডেকে আনতে পারে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে, তাই দ্রুত কার্যকর নীতিসহায়তা জরুরি।’
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে ১ দশমিক ১০ শতাংশ। এছাড়া জার্মানিতে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ রফতানি কমেছে। তবে এ নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল পণ্যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
কয়েক বছর ধরেই দেশের বস্ত্র খাত নাজুক পরিস্থিতিতে ছিল। তবে আমদানীকৃত সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে খাতটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) পরিচালক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি করা সুতার দাম বাড়ায় স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে। পোশাক রফতানিকারকরা এখন দেশীয় মিল থেকে বেশি সুতা নিচ্ছেন, যা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। সুতা বিক্রি বাড়লে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাড়বে এবং লোকসান কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট না থাকলে বন্ধ মিলও চালু হতে পারে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ; বিদেশী ক্রেতারা নতুন অর্ডার স্থগিত রাখছেন, শিপমেন্টও পেছাচ্ছে। এতে উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতির ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করছে।’